
শিরোনাম
১ ভূমিকা
২ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেহমানদারি
৩ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মেহমানদারি
৪ আরবদের মেহমানদারি
৫ সাহাবীদের মেহমানদারি
৬ মেহমানের জন্য করণীয় আদাব
৭ মেজবানের করণীয়
৮ মেহমানদের সাথে যেসব আচরণ করা উচিৎ
ভূমিকা
ﺇِﻥَّ ﺍﻟْﺤَﻤْﺪُ ﻟﻠﻪِ، ﻧَﺤْﻤَﺪُﻩُ ﻭَﻧَﺴْﺘَﻌِﻴْﻨُﻪُ ﻭَﻧَﺴْﺘَﻐْﻔِﺮُﻩُ،
ﻭَﻧَﻌُـﻮْﺫُ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻣِﻦْ ﺷُﺮُﻭْﺭِ ﺃَﻧْﻔُﺴِﻨَﺎ، ﻭَﻣِﻦْ ﺳَﻴِّﺌَﺎﺕِ
ﺃَﻋْﻤَﺎﻟِﻨَﺎ، ﻣَﻦْ ﻳَّﻬْﺪِﻩِ ﺍﻟﻠﻪُ ﻓَﻼَ ﻣُﻀِﻞَّ ﻟَﻪُ، ﻭَﻣَﻦْ ﻳُّﻀْﻠِﻞِ
ﺍﻟﻠﻪُ ﻓَﻼَ ﻫَﺎﺩِﻱَ ﻟَﻪُ، ﻭَﺃَﺷْﻬَﺪُ ﺃَﻥْ ﻻَّ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻَّ ﺍﻟﻠﻪُ ﻭَﺣْﺪَﻩُ
ﻻَ ﺷَﺮِﻳْﻚَ ﻟَﻪُ، ﻭَﺃَﺷْﻬَﺪُ ﺃَﻥَّ ﻣُﺤَﻤَّﺪًﺍ ﻋَﺒْﺪُﻩُ ﻭَﺭَﺳُﻮْﻟُﻪُ
নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর
কাছে সাহায্য চাই, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর নিকট আমরা
আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্টতা ও আমাদের কর্মসমূহের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় কামনা
করি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, তাকে গোমরাহ করার কেউ নেই। আর যাকে গোমরাহ
করেন তাকে হিদায়াত দেওয়ারও কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো
সত্যিকার ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোনো শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি,
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। সালাত ও
সালাম নাযিল হোক তাঁর ওপর, তার পরিবার-পরিজন ও তার সাহাবীদের ওপর এবং যারা
কিয়ামত অবধি যথার্থভাবে তাদের অনুসরণ করেন তাদের ওপর।মেহমানদারি করা
ইসলামের একটি গুরুত্ব পূর্ণ আমল। ইসলাম উম্মতে মুসলিমাকে মেহমানদারি করা ও
মেহমানের সম্মান রক্ষা করার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মেহমানের মেহমানদারি
করা, মেহমানের করণীয়, মেজবানের করণীয় ও মেহমানদারির গুরুত্ব সম্পর্কে এ
প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেহমানদারি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাধিক দয়ালু, দানশীল ও
আতিথেয়তায় প্রসিদ্ধ। তিনি কোনো কিছুই তার নিজের জন্য ধরে রাখতেন না, যা
কিছু তার নিকট আসত, তার সবই তিনি সাথে সাথে দান করে দিতেন এবং সাথীদের
মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম আনাস
ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু যিনি দশ বছর যাবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন, তিনি তাঁর দানশীলতা ও দয়াদ্রতার বর্ণনা
দিতে গিয়ে বলেন,
« ﻣﺎ ﺳﺌﻞ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻋﻠﻰ ﺍﻹﺳﻼﻡ ﺷﻴﺌًﺎ ﺇﻻ ﺃﻋﻄﺎﻩ، ﻗﺎﻝ :
ﻓﺠﺎﺀﻩ ﺭﺟﻞ ﻓﺄﻋﻄﺎﻩ ﻏﻨﻤًﺎ ﺑﻴﻦ ﺟﺒﻠﻴﻦ ﻓﺮﺟﻊ ﺇﻟﻰ ﻗﻮﻣﻪ ﻓﻘﺎﻝ : ﻳﺎ ﻗﻮﻣﻲ ﺃﺳﻠﻤﻮﺍ ﻓﺈﻥ
ﻣﺤﻤﺪًﺍ ﻳﻌﻄﻲ ﻋﻄﺎﺀً ﻻ ﻳﺨﺸﻰ ﺍﻟﻔﺎﻗﺔ »
“ইসলামের যুগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কোনো কিছু
চাওয়া হলে তিনি কখনোই না বলেন নি। যখন কোনো কিছু চাইতেন তা তিনি সাথে সাথে
দিয়ে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
নিকট চাইলে তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ছাগলগুলো তাকে দিয়ে দেন। লোকটি
তার সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট গিয়ে বলল, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকরা! তোমরা
ইসলাম গ্রহণ কর। কারণ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে
এত বেশি দান করেন, তিনি অভাবকে ভয় করেন না”।
অপর একটি বর্ণনায় বর্ণিত, আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
« ﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻟَﺎ ﻳَﺪَّﺧِﺮُ ﺷَﻴْﺌًﺎ ﻟِﻐَﺪٍ »
“আল্লাহর রাসূল কোনো কিছুই আগামী দিনের জন্য জমা করে রাখতেন না”।
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
« ﻛﺎﻥ ﺃﺟﻮﺩ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺑﺎﻟﺨﻴﺮ، ﻭﺃﺟﻮﺩ ﻣﺎ ﻳﻜﻮﻥ ﻓﻰ ﺷﻬﺮ ﺭﻣﻀﺎﻥ، ﻭﻛﺎﻥ ﺇﺫﺍ ﻟﻘﻴﻪ ﺟﺒﺮﻳﻞ ﺃﺟﻮﺩ ﺑﺎﻟﺨﻴﺮ ﻣﻦ ﺍﻟﺮﻳﺢ ﺍﻟﻤﺮﺳﻠﺔ ».
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বাধিক
দানশীল। আর রমযান মাসে তিনি সবচেয়ে বেশি দান করতেন। যখন জিবরীল ‘আলাইহিস
সালাম তাঁর সাথে সাক্ষাত করত, তখন তিনি প্রবল বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল
হতেন”।
যাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
« ﻣﺎﺳﺌﻞ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺷﻴﺌﺎ ﻗﻂ ﻓﻘﺎﻝ : ﻻ»
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কোনো কিছু চাওয়া হলে, তিনি কখনো না করেন নি”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা
রাদিয়াল্লাহু আনহার উক্তি আল্লাহর রাসূলের আতিথেয়তা সম্পর্কে যথেষ্ট।
তিনিসকল উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম ঈমান আনয়নকারী, জগতের শ্রেষ্ঠতম চারজন
রমণীর অন্যতম। যিনি তার সকল ধনসম্পদের পাহাড় রাসূলের কদমেহাযির করে দেন।
রাসূলের সব ছেলেমেয়ে তার গর্ভে জন্মলাভ করেন। তিনি ২৫ বছর উম্মুল মুমিনীন
হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। অহী
লাভের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অস্থিরতায় তিনি সান্তনা
দেন এবং বলেন, ﻛﻼّ ﻭﺍﻟﻠﻪِ ﻣﺎ ﻳُﺨﺰِﻳﻚ ﺍﻟﻠﻪ ﺍَﺑَﺪَ َ “আল্লাহর শপথ তিনি
আপনাকে কখনই অপমান ও অপদস্থ করবেন না”। তার কারণ হিসেবে তিনি আল্লাহর
রাসূলের কয়েকটি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেন। তার মধ্যে অন্যতম গুণ হলো,
ﻭﺗﻘﺮﻯ ﺍﻟﻀﻴﻒُ “আপনি অতিথির সেবা করেন”।
কা‘বা শরীফ মক্কায় অবস্থিত বিধায় হাজার হাজার বছর থেকে কা‘বা কেন্দ্রিক
বিভিন্ন এলাকা ও জনপদ থেকে তীর্থযাত্রীরা ভিড় জমাতো। কুরাইশ পৌত্তলিকেরা
বিদেশীদের জীবন সম্পদ লুণ্ঠনের উৎসব করত বিশেষ করে হজ মৌসুমে। যদিও জাতিগত
ভাবে আরবরা অতিথিপরায়ণ কিন্তু অসৎদের আর মূল্যবোধের বালাই থাকে না।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাল্যকাল থেকে অসহায় বিদেশী ও
অতিথিদের সহায় সম্পদ লুণ্ঠনের দৃশ্য দেখে আসছিলেন। তাদের যুলুম নির্যাতন ও
লন্ঠনের দৃশ্য দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তিনি তাদের স্রোতের বিপরীতে
গিয়ে অসহায় মযলুম নির্যাতিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ান, তাদের সাহায্যে এগিয়ে
আসেন। দেশ থেকে অশান্তি দূর করা, বিদেশী মেহমানদের জান-মাল রক্ষা
করা,গরীব-দুঃখীকে সাহায্য করা, দুর্বলদেরকে যালিমদের হাত থেকে রক্ষা করা
এবং আমরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনের চেষ্টায় তিনি ছিলেন
বদ্ধ পরিকর। একজন স্ত্রীর মন্তব্য তার স্বীয় স্বামীর ব্যাপারে খুবই
প্রণিধানযোগ্য। কারণ, সুখে-দুঃখে, দিনে-রাতে সকালে-বিকেলে, রাগ-বিরাগ
সর্বাবস্থায় নিবিড়ভাবে স্বামীকে দেখার সুযোগ তিনিই লাভ করেন। তারপরও সবার
প্রশংসার চেয়ে খাদিজার উক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি স্ত্রীও হন অতীব
বিচক্ষণ, সচেতন ও জ্ঞান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন তবে তো কথাই নেই। এ ছাড়াও রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যান্য সাহাবীদের বাণীও প্রণিধানযোগ্য।
মেহমানদারির সম্পর্কে ঈমানের সাথে। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের দয়া ও অনুগ্রহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মেহমানদের মেহমানদারি
করা। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« ﻣَﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﺆْﻣِﻦُ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﻟْﻴَﻮْﻡِ ﺍﻟْﺂﺧِﺮِ، ﻓَﻠَﺎ ﻳُﺆْﺫِ
ﺟَﺎﺭَﻩُ، ﻣَﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﺆْﻣِﻦُ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﻟْﻴَﻮْﻡِ ﺍﻟْﺂﺧِﺮِ، ﻓَﻠْﻴُﻜْﺮِﻡْ
ﺿَﻴْﻔَﻪُ، ﻣَﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﺆْﻣِﻦُ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﻟْﻴَﻮْﻡِ ﺍﻟْﺂﺧِﺮِ، ﻓَﻠْﻴَﻘُﻞْ
ﺧَﻴْﺮًﺍ ﺃَﻭْ ﻟِﻴَﺼْﻤُﺖْ »
“যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাত দিবসের প্রতি বিশ্বাস করে, সে যেন
প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও আখিরাত দিবসের প্রতি
বিশ্বাস করে, সে যেন মেহমানের মেহমানদারি করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি
ও আখিরাত দিবসের প্রতি বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
« ﻻ ﺗﺰﺍﻝ ﺍﻟﻤﻼﺋﻜﺔ ﺗﺼﻠﻰ ﻋﻠﻰ ﺃﺣﺪﻛﻢ ﻣﺎ ﺩﺍﻣﺖ ﻣﺎﺋﺪﺗﻪ ﻣﻮﺿﻮﻋﺔ ﺑﻴﻦ ﻳﺪﻳﻪ ﺣﺘﻰ ﻳﺮﻓﻊ ».
“মেহমানের সামনে যতক্ষণ দস্তরখান বিছানো থাকে, তা না উঠানো পর্যন্ত ফিরিশতারা তোমাদের ওপর রহমত বর্ষণ করতে থাকে”।
বর্তমানে আমরা মেহমানদের মেহমানদারী করতে চাইনা। মেহমানকে আমরা ভয় পাই,
ঝামেলা মনে করি। অথচ একজন সত্যিকার মুসলিমের নিকট মেহমানদারি করা খুব প্রিয়
এবং সম্মানজনক কাজ। মেহমানদারি করার বিষয়টি একজন মুসলিমের ঈমানের সাথে
সম্পর্কিত। এটা একজন মুমিনের ঈমানের পরিপূর্ণতাকে বহন করে। মেহমানের
মেহমানদারি করা এবং তাদের সম্মান করা পূর্বের নবী রাসূলদের মধ্যেও ছিল।
ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের যুগ থেকে এর ধারাবাহিকতা শুরু হয়।